Personal

আমার প্রযুক্তির স্বপ্ন: একটি অদম্য কৌতূহল থেকে পথচলার শুরু

পর্ব ১ — যে স্বপ্নের অর্থ তখন নিজেও জানতাম না

মানুষের জীবনে কিছু স্বপ্ন থাকে, যেগুলোর শুরুটা খুব সাধারণ হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। কখনো সেই স্বপ্নের পেছনে থাকে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা, আবার কখনো থাকে শুধুই কৌতূহল, অজানাকে জানার আগ্রহ এবং নিজের মতো করে কিছু করার ইচ্ছা। আমার প্রযুক্তির প্রতি ভালোবাসার শুরুটাও হয়েছিল ঠিক এভাবেই। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তি, বিশেষ করে ইন্টারনেট আমাকে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণ করত। অথচ তখন প্রযুক্তি সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। ইন্টারনেট কীভাবে কাজ করে, এর মাধ্যমে কী কী করা সম্ভব কিংবা ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে কতটা বদলে দিতে পারে, এসব সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না।

শুধু মনে হতো, এই অদৃশ্য যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা আমাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং একদিন নিজের হাতে ব্যবহার করে দেখতে হবে। অন্যদের কাছে বিষয়টি হয়তো সাধারণ একটি প্রযুক্তিগত আগ্রহ ছিল, কিন্তু আমার কাছে এটি ছিল এক অজানা পৃথিবীকে আবিষ্কার করার আকাঙ্ক্ষা। সেই আগ্রহ কখন যে আমার জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্নে পরিণত হয়েছিল, তা নিজেও বুঝতে পারিনি।

সময়টা ২০০৪ থেকে ২০০৫: ইন্টারনেট তখন এক রহস্যময় পৃথিবী

আজকের দিনে ইন্টারনেট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাতের স্মার্টফোন দিয়ে মুহূর্তেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের তথ্য জানা যায়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, এমনকি ঘরে বসেই অসংখ্য কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু ২০০৪ থেকে ২০০৫ সালের বাংলাদেশ ছিল অনেকটাই ভিন্ন। সেই সময় ব্যক্তিগত কম্পিউটার সবার ঘরে ছিল না। ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগও ছিল সীমিত। প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার অন্যতম মাধ্যম ছিল বই, পত্রপত্রিকা কিংবা হাতে গোনা কিছু সাইবার ক্যাফে।

আমার সহপাঠীরা যখন পাঠ্যবই, পরীক্ষা আর ভালো ফলাফলের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমার চিন্তাজুড়ে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছিল অন্য এক পৃথিবী। সেটি ছিল ইন্টারনেটের পৃথিবী। ইন্টারনেট আসলে কী, কীভাবে কাজ করে, পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করে, একটি কম্পিউটার থেকে পাঠানো তথ্য কীভাবে হাজার হাজার মাইল দূরের আরেকটি কম্পিউটারে পৌঁছে যায়, এমন অসংখ্য প্রশ্ন সারাক্ষণ মাথায় ঘুরত। উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরও নতুন প্রশ্নের জন্ম হতো। একসময় ইন্টারনেট সম্পর্কে জানার আগ্রহটা রীতিমতো নেশায় পরিণত হলো।

দিনাজপুরের মুন্সিপাড়া লাইব্রেরি এলাকায় গিয়ে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সম্পর্কিত বই খুঁজতাম। নতুন কোনো বই পেলেই কেনার চেষ্টা করতাম। অনেক সময় একটি বই হাতে পাওয়ার এক দিনের মধ্যেই পড়ে শেষ করে ফেলতাম। কিন্তু বই শেষ হলেও কৌতূহল শেষ হতো না। বরং মনে হতো, যতটুকু জানলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু এখনো অজানা রয়ে গেছে। একটি বিষয় বুঝতে পারলে সেটি নিয়ে আরও গভীরভাবে জানার ইচ্ছা তৈরি হতো। এভাবেই বইয়ের পাতায় পাতায় নিজের অজান্তে আমি প্রযুক্তির এক বিশাল জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছিলাম।

সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল, আমার নিজের কোনো কম্পিউটার ছিল না। ফলে বইয়ে পড়া বিষয়গুলো বাস্তবে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পেতাম না। শুধু পড়তাম, কল্পনা করতাম এবং নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করতাম। কখনো কোনো প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে পড়ার পর মনে মনে সেটির একটি চিত্র তৈরি করার চেষ্টা করতাম। আজ পেছনে তাকালে মনে হয়, সেই সময়ের বই পড়া, প্রশ্ন করা এবং উত্তর খোঁজার অভ্যাসই ধীরে ধীরে আমার চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছিল।

একটি ইমেইল এবং আমার নির্ঘুম রাতগুলো

আমার এখনো মনে আছে, সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ইমেইল সম্পর্কে একটি অধ্যায় ছিল। সেখানে লেখা ছিল, ইমেইলের মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে চিঠি পাঠানো যায়। বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। তখনকার দিনে সাধারণ ডাকযোগে একটি চিঠি পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লাগত। অথচ বইয়ে বলা হচ্ছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেই চিঠি কয়েক মুহূর্তেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। বিষয়টি আমার কাছে এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে, এর পেছনের রহস্য জানার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলাম।

কত রাত যে এই একটি প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করেছি, তার হিসাব নেই। একটি চিঠি কীভাবে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায়? চিঠিটা আসলে কীভাবে যায়, কোন পথ দিয়ে যায়, কম্পিউটার কীভাবে বুঝতে পারে কোথায় পাঠাতে হবে, এত দূরত্ব অতিক্রম করেও কীভাবে এত দ্রুত পৌঁছে যায়? প্রশ্নগুলো মাথার মধ্যে ঘুরতেই থাকত। কখনো বিছানায় শুয়ে এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাত কেটে যেত। অথচ উত্তর খুঁজে পাওয়ার মতো পর্যাপ্ত বই কিংবা বাস্তবে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ তখন আমার ছিল না।

আজকের দিনে প্রশ্নগুলো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ইমেইল পাঠাই, মেসেজ করি, ভিডিও কলে কথা বলি। এসবের পেছনে কীভাবে প্রযুক্তি কাজ করছে, তা নিয়ে বেশির ভাগ মানুষকে আলাদাভাবে ভাবতে হয় না। কিন্তু সেই বয়সে আমার কাছে বিষয়টি ছিল এক অবিশ্বাস্য রহস্য। আমার কাছে ইন্টারনেট তখন শুধু যোগাযোগের একটি মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল এমন এক অজানা জগৎ, যার প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য আমি অধীর হয়ে থাকতাম।

এসএসসি পরীক্ষা: আগ্রহ আর বাস্তবতার মাঝখানে

এভাবেই সময় এগিয়ে চলছিল। এর মধ্যে সামনে চলে এলো এসএসসি পরীক্ষা। পরিবার, শিক্ষক এবং আশপাশের সবার কাছে পরীক্ষাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবাই চাইতেন, আমি ভালোভাবে প্রস্তুতি নিই এবং ভালো ফলাফল করি। কিন্তু আমার মনের ভেতরে তখন অন্য এক অস্থিরতা কাজ করছিল। আমি কম্পিউটার ব্যবহার করতে চাই, ইন্টারনেট সম্পর্কে আরও জানতে চাই, বইয়ে পড়া বিষয়গুলো নিজের হাতে পরীক্ষা করে দেখতে চাই। অথচ সামনে পরীক্ষা। মনে হতে লাগল, পরীক্ষাটাই যেন আমার আর ইন্টারনেটের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একসময় পরিবারকে বলেছিলাম, কোনোভাবে একটি কম্পিউটার কিনে দেওয়া সম্ভব কি না। কিন্তু সেই সময়ের বাস্তবতায় একটি কম্পিউটার কেনা মোটেও সহজ বিষয় ছিল না। তার ওপর কম্পিউটার কেন এত জরুরি, ইন্টারনেট নিয়ে এত আগ্রহের ভবিষ্যৎ কী, এসব প্রশ্নের উত্তর তখন পরিবারের কাছে যেমন স্পষ্ট ছিল না, আমার কাছেও তেমন ছিল না। আমি শুধু জানতাম, কম্পিউটার পেলে অনেক কিছু শিখতে পারব। কিন্তু সেই শেখা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা জানতাম না। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল আমি পড়াশোনায় মনোযোগ দেব, ভালো ফলাফল করব এবং ভবিষ্যতে একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছাব। তাঁদের এই প্রত্যাশার গুরুত্ব আমি বুঝতাম, কিন্তু নিজের ভেতরের কৌতূহলটাকেও উপেক্ষা করতে পারতাম না।

শেষ পর্যন্ত কম্পিউটার পাওয়ার ইচ্ছাটা আপাতত মনের মধ্যেই রেখে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। তবে মনে মনে একটা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলে প্রায় তিন মাসের ছুটি পাওয়া যাবে। সেই তিন মাস অন্তত নিজের মতো করে ইন্টারনেট নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে পারব। অন্যদের কাছে পরীক্ষার পরের ছুটি হয়তো বিশ্রাম কিংবা ঘোরাঘুরির সুযোগ। আমার কাছে সেটি ছিল প্রযুক্তির জগতে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করার অপেক্ষা। পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিনটির জন্য তাই আমার অপেক্ষার একটা আলাদা কারণ ছিল।

দুই বিদেশি অতিথি এবং নতুন করে কৌতূহল

এসএসসি পরীক্ষার আগে আমাদের বাসায় দুজন বিদেশি অতিথি এসেছিলেন। একজন আমেরিকান, অন্যজন ব্রাজিলিয়ান। তাঁদের সঙ্গে পরিচয় এবং ইন্টারনেট সম্পর্কিত কিছু আলোচনা আমার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এত দিন বইয়ের পাতায় যে প্রযুক্তির কথা পড়ছিলাম, যে বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে কল্পনা করছিলাম, সেই পৃথিবীটা যেন ধীরে ধীরে আরও বাস্তব হয়ে উঠছিল। তাঁদের সঙ্গে আলোচনার পর ইন্টারনেট নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা আরও বিস্তৃত হতে শুরু করে।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ কীভাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, ইন্টারনেট কীভাবে দূরত্বের সীমাবদ্ধতা কমিয়ে দিতে পারে, এসব বিষয় আমাকে নতুনভাবে ভাবাতে শুরু করেছিল। আমার কৌতূহল তখন আর শুধু ইন্টারনেট কীভাবে কাজ করে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম, এই প্রযুক্তি দিয়ে আসলে কী কী করা সম্ভব। সেই সময়ের ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলো আমার কাছে অনেক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছিল। প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে জানার যে আগ্রহ আমার মধ্যে তৈরি হয়েছিল, এই ঘটনাটি সেটিকে আরও গভীর করেছিল।

Dolls Cyber Cafe: অজানা পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয়

অবশেষে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অন্যদের মতো খুব বেশি বিশ্রামের পরিকল্পনা আমার ছিল না। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, এবার ইন্টারনেট নিয়ে নিজের মতো করে সময় কাটানো যাবে। এত দিন যে বিষয়গুলো বইয়ে পড়েছি, যেগুলো নিয়ে রাতের পর রাত ভেবেছি, সেগুলো এবার বাস্তবে দেখার সুযোগ হবে। পরীক্ষার পরের অবসর সময়টুকু তাই আমার কাছে অন্যরকম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

দিনাজপুরের মুন্সিপাড়ায় তখন Dolls Cyber Cafe নামে একটি সাইবার ক্যাফে ছিল। সেখানে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করলাম। সাইবার ক্যাফের কম্পিউটারের সামনে বসার অনুভূতিটা ছিল অন্যরকম। এত দিন বইয়ের পাতায় যে জগতের কথা পড়েছি, মনে মনে যে বিষয়গুলো কল্পনা করেছি, এবার সেগুলো নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাচ্ছি। কম্পিউটারের পর্দায় একটি ওয়েবসাইট খুলে যাওয়া, বিভিন্ন তথ্য খুঁজে পাওয়া কিংবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নতুন কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে পারা, প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আমার কাছে ছিল আনন্দের।

আমার কাছে ইন্টারনেট ব্যবহার মানে শুধু ওয়েবসাইট দেখা কিংবা সময় কাটানো ছিল না। আমি জানতে চাইতাম, একটি ওয়েবসাইট কীভাবে তৈরি হয়, তথ্যগুলো কোথায় সংরক্ষিত থাকে, একটি কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে কীভাবে পৌঁছায় এবং এই বিশাল ব্যবস্থার পেছনে কী ধরনের প্রযুক্তি কাজ করে। প্রতিটি নতুন অভিজ্ঞতা আমাকে আরও গভীরে যেতে উৎসাহিত করত। একটি বিষয় বুঝতে পারলে আরও দশটি বিষয় জানার আগ্রহ তৈরি হতো। যত বেশি শিখছিলাম, তত বেশি উপলব্ধি করছিলাম, আমার জানার জগৎ এখনো কত ছোট।

সেই সময় আমার কাছে কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছিল না। প্রযুক্তিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কোনো সুস্পষ্ট ধারণাও ছিল না। আমি জানতাম না, ভবিষ্যতে নিজের কোনো সফটওয়্যার তৈরি করব কি না, কোনো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব কি না, কিংবা এই আগ্রহ আমাকে জীবনের কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে। আমার কাছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নতুন কিছু শেখা এবং সেই শেখার আনন্দ অনুভব করা। আমি শুধু জানতে চাইতাম, শিখতে চাইতাম এবং নিজের হাতে নতুন কিছু তৈরি করার স্বপ্ন দেখতাম।

যে পথচলার শুরু হয়েছিল একটি প্রশ্ন থেকে

আজ এত বছর পর সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে বুঝতে পারি, মানুষের জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা শুরু হয় কোনো সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত থেকে নয়, বরং একটি সাধারণ কৌতূহল থেকে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একটি ইমেইল কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই প্রযুক্তির প্রতি আমার আগ্রহ গভীর হতে থাকে। দিনাজপুরের মুন্সিপাড়ার বইয়ের দোকান, কম্পিউটারবিষয়ক বইয়ের পাতা আর Dolls Cyber Cafe এর কম্পিউটারের সামনে কাটানো সময়গুলো ধীরে ধীরে আমার জীবনের ভবিষ্যৎ পথচলার ভিত্তি তৈরি করছিল।

তখন আমার নিজের কোনো কম্পিউটার ছিল না। ছিল না পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা, কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কিন্তু ছিল জানার প্রবল আগ্রহ এবং নিজের কল্পনার চেয়েও বড় কিছু করার ইচ্ছা। আমি তখনো জানতাম না, এই আগ্রহ আমাকে কত দূর নিয়ে যাবে। জানতাম না, সামনে কত বাধা, কত সিদ্ধান্ত আর কত অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিলাম, প্রযুক্তির সঙ্গে সময় কাটাতে আমার ভালো লাগে এবং এই বিষয়টি নিয়ে যত বেশি জানছি, তত বেশি জানার ইচ্ছা তৈরি হচ্ছে।

আজ পেছনে তাকালে মনে হয়, সেই সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পরীক্ষার ফলাফল কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল না। সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল নিজের ভালো লাগার একটি বিষয় খুঁজে পাওয়া এবং সীমিত সুযোগের মধ্যেও সেটিকে জানার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কারণ জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পেছনে সব সময় বড় কোনো ঘটনা থাকে না। কখনো একটি বই, একটি প্রশ্ন কিংবা ছোট্ট কোনো অভিজ্ঞতাও মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমার জীবনে প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক সেভাবেই গড়ে উঠেছিল।

তখনো জানতাম না, এই কৌতূহল একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়গুলোর একটি হয়ে উঠবে। সেই সময় আমি শুধু নিজের আগ্রহের পেছনে ছুটছিলাম। আর অজান্তেই শুরু হয়ে গিয়েছিল আমার জীবনের এক দীর্ঘ পথচলা। আজ বুঝতে পারি, কোনো কিছু শেখার প্রতি প্রকৃত আগ্রহ থাকলে সেটি শুধু জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত এবং জীবনের পথচলাকেও প্রভাবিত করে।

আমার প্রযুক্তির সঙ্গে পথচলার প্রথম অধ্যায়টি ছিল মূলত সেই আগ্রহ আর কৌতূহলের গল্প। এর পরের দিনগুলোতে সেই আগ্রহ আমাকে আরও নতুন অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করিয়েছিল। কখনো নিজের পড়ার বই বিক্রি করে প্রযুক্তির বই কিনেছি, কখনো নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখেছি, আবার কখনো সীমিত সুযোগের মধ্যেই নিজের প্রথম ওয়েবসাইট তৈরি করার আনন্দ খুঁজে পেয়েছি। তবে সেসব অভিজ্ঞতার গল্প থাকছে পরবর্তী পর্বে।

পরবর্তী পর্ব: এসএসসির পাঠ্যবই বিক্রি করে প্রযুক্তির বই কেনা, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার অপূর্ণ ইচ্ছা, পার্বতীপুরের কলেজজীবন এবং ২০০৭ সালে নিজের প্রথম ওয়েবসাইট তৈরির গল্প।

শাহ নাওয়াজে পাভেল

আমার জীবন ও প্রযুক্তির সঙ্গে পথচলার গল্প | পর্ব ১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close