আমার প্রযুক্তির স্বপ্ন: আগ্রহ থেকে নিজের কিছু তৈরি করার স্বপ্ন
পর্ব ২: পাঠ্যবই বিক্রি, অপূর্ণ ইচ্ছা, কলেজজীবন এবং প্রথম ওয়েবসাইট

যে আগ্রহ আর শুধু কৌতূহলে সীমাবদ্ধ ছিল না
জীবনের কিছু সময় থাকে, যখন আমরা বুঝতে পারি না আমাদের ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেই বয়সে নিজের ভালো লাগার বিষয়টিকে অনুসরণ করাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ। কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনা কিংবা অর্থ উপার্জনের চিন্তা থেকে প্রযুক্তির প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়নি। বরং যত বেশি জানছিলাম, তত বেশি মনে হচ্ছিল, এই বিশাল পৃথিবীর খুব সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত বুঝতে পেরেছি।
আগের পর্বে বলেছিলাম, কীভাবে ইন্টারনেট সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমাকে দিনাজপুরের মুন্সিপাড়ার বইয়ের দোকান থেকে Dolls Cyber Cafe পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। সেই সময় ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচয় আমার চিন্তাভাবনায় একধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করে। আগে শুধু জানতে চাইতাম প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে। ধীরে ধীরে সেই প্রশ্নের সঙ্গে নতুন একটি ইচ্ছা যুক্ত হলো। আমি নিজেও কি এমন কিছু তৈরি করতে পারব, যা অন্য মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখতে কিংবা ব্যবহার করতে পারবে?
আজকের দিনে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করার বিষয়টি অনেকের কাছেই সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময় আমার কাছে এটি ছিল বিশাল একটি স্বপ্ন। কারণ নিজের কোনো কম্পিউটার ছিল না, শেখার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল না, এমনকি কোথা থেকে শুরু করতে হবে, সেটিও পরিষ্কারভাবে জানতাম না। তবু মনে হতো, কোনো না কোনোভাবে আমাকে শিখতেই হবে।
এসএসসির পাঠ্যবই বিক্রি করে প্রযুক্তির বই কেনা
আমার জীবনের সেই সময়ের একটি ঘটনা আজও বিশেষভাবে মনে পড়ে। এসএসসি পরীক্ষার পর নিজের কিছু পাঠ্যবই বিক্রি করে কম্পিউটার ও প্রযুক্তিবিষয়ক বই কিনেছিলাম।
একজন শিক্ষার্থীর কাছে পাঠ্যবই বিক্রি করে অন্য বই কেনার ঘটনাটি হয়তো খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু আমার কাছে এর গুরুত্ব ছিল অন্যরকম। কারণ তখন প্রযুক্তি শেখার জন্য আলাদা কোনো অর্থের ব্যবস্থা ছিল না। নিজের পছন্দের বিষয়ে জানার জন্য যতটুকু সুযোগ পাওয়া যায়, সেটুকুই কাজে লাগানোর চেষ্টা করতাম।
আমার কাছে প্রযুক্তির বইগুলো ছিল অজানা পৃথিবীতে প্রবেশ করার একেকটি দরজা। একটি বইয়ের মধ্যে হয়তো কম্পিউটারের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে লেখা আছে, অন্যটিতে ইন্টারনেট কিংবা ওয়েবসাইট তৈরির ধারণা। প্রতিটি নতুন বিষয় আমাকে আরও নতুন কিছু জানার দিকে নিয়ে যেত।
বই পড়তে পড়তে অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতাম, আবার এমন অনেক বিষয় সামনে আসত, যেগুলো বুঝতে বাস্তবে কম্পিউটার ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিন্তু নিজের কম্পিউটার না থাকায় সেই সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে অনেক কিছুই বই পড়ে বুঝতে হতো, মনে রাখতে হতো এবং সুযোগ পেলে পরীক্ষা করে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হতো।
এখন ভাবলে মনে হয়, সেই সময় আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল শেখার ইচ্ছা। অর্থের সীমাবদ্ধতা ছিল, প্রযুক্তিগত সুযোগসুবিধার অভাব ছিল, কিন্তু নতুন কিছু জানার আগ্রহের কোনো অভাব ছিল না।
সেই বয়সে হয়তো বুঝতাম না, এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো আমার জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে। শুধু জানতাম, প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও জানতে চাই। আর সেই জানার ইচ্ছা পূরণের জন্য নিজের সামর্থ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, ততটুকু চেষ্টা করে যেতে চাই।
কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার স্বপ্ন
প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে শুরু করলাম। একসময় মনে হলো, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পারলে হয়তো এই বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে শেখা সম্ভব হবে।
তখন আমার কাছে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং মানে ছিল নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করার সুযোগ। কম্পিউটার কীভাবে কাজ করে, সফটওয়্যার কীভাবে তৈরি হয়, ইন্টারনেটের পেছনের প্রযুক্তিগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখার ইচ্ছা ছিল প্রবল।
কিন্তু মানুষের সব ইচ্ছা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্ন থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই পথে এগোনো সম্ভব হয়নি।
জীবনের এই বিষয়টি নিয়ে আজও ভাবি। কারণ আমাদের সমাজে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অনেক বিষয় কাজ করে। পরিবারের প্রত্যাশা, আর্থিক সামর্থ্য, শিক্ষার সুযোগ এবং পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা অনেক সময় ব্যক্তিগত আগ্রহের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির প্রতি ভালোবাসা থাকলেও সেই ভালোবাসাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। তবে একটি বিষয় কখনো বদলায়নি। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে না পারলেও কম্পিউটার সম্পর্কে জানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলিনি।
বরং ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছিলাম, কোনো বিষয়ে শেখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেখার পথ শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বই পড়ে, নিজে চেষ্টা করে, ভুল করে এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েও অনেক কিছু জানা সম্ভব।
অবশ্য তখন এসব নিয়ে এত গভীরভাবে ভাবার বয়স কিংবা অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। শুধু নিজের পছন্দের বিষয়টিকে কোনোভাবে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম।
পার্বতীপুরের কলেজজীবন এবং নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই
এসএসসি পরীক্ষার পর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। কলেজজীবনের জন্য পার্বতীপুরে আমার পথচলা শুরু হয়।
স্কুলজীবন থেকে কলেজজীবনে প্রবেশের সময় একজন শিক্ষার্থীর সামনে অনেক পরিবর্তন আসে। পড়াশোনার ধরন বদলায়, দায়িত্ব বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার প্রয়োজনীয়তাও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। আমার জীবনেও সেই পরিবর্তনগুলো আসছিল।
কিন্তু আমার চিন্তার একটি বড় অংশ তখনো প্রযুক্তিকে ঘিরে ছিল।
পড়াশোনা ছিল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অন্যদিকে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমাকে নিজের মতো করে নতুন কিছু শেখার দিকে টানত। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সব সময় সহজ ছিল না।
একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে নিজের ভালো লাগার একটি বিষয়ে গভীরভাবে জানার আকাঙ্ক্ষা। তখন হয়তো বুঝতাম না, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি আমার ভবিষ্যৎ জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কলেজজীবনের সেই সময়টাতে প্রযুক্তি নিয়ে আমার ভাবনারও পরিবর্তন হচ্ছিল। আগে ইন্টারনেট ব্যবহার করাটাই ছিল আনন্দের। পরে মনে হতে শুরু করল, শুধু অন্যের তৈরি ওয়েবসাইট দেখলে হবে না। আমাকে জানতে হবে, এসব ওয়েবসাইট কীভাবে তৈরি করা হয়।
একটি ওয়েবসাইটের পেছনে কী থাকে, কীভাবে একটি পেজ তৈরি হয়, কীভাবে লেখা ও ছবি সাজানো হয়, কীভাবে একটি ঠিকানা লিখলেই পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে সেই ওয়েবসাইট দেখা যায়, এসব বিষয় আমাকে আকর্ষণ করতে শুরু করে।
এভাবেই প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার আগ্রহ ধীরে ধীরে কিছু তৈরি করার ইচ্ছায় রূপ নিতে থাকে।
২০০৭ সাল: নিজের প্রথম ওয়েবসাইট তৈরির অভিজ্ঞতা
২০০৭ সাল আমার প্রযুক্তির সঙ্গে পথচলার একটি বিশেষ বছর। কারণ এই বছরেই নিজের প্রথম ওয়েবসাইট তৈরি করি। আজ এত বছর পর ঘটনাটির কথা ভাবলে মনে হয়, এটি ছিল আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। যদিও তখন হয়তো এর ভবিষ্যৎ গুরুত্ব বুঝতে পারিনি।
একসময় যে ছেলেটি পাঠ্যবইয়ে ইমেইলের কথা পড়ে অবাক হতো, ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি বার্তা কীভাবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায় তা নিয়ে রাতের পর রাত ভাবত, সেই ছেলেটিই এবার নিজের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করার অভিজ্ঞতা অর্জন করল।
অন্যের তৈরি ওয়েবসাইট দেখা আর নিজের হাতে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করার মধ্যে যে পার্থক্য, সেটি তখন নতুনভাবে উপলব্ধি করেছিলাম।
একটি ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারা মানে শুধু কিছু লেখা কিংবা ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশ করা নয়। আমার কাছে এর অর্থ ছিল এত দিন যে প্রযুক্তিকে দূর থেকে দেখেছি, সেই প্রযুক্তির একটি ছোট অংশের সঙ্গে এবার সরাসরি যুক্ত হতে পারা।
সেই সময়ের সীমিত জ্ঞান ও সুযোগের মধ্যে নিজের প্রথম ওয়েবসাইট তৈরি করা আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। মনে হতে শুরু করল, চেষ্টা করলে হয়তো আরও অনেক কিছু শেখা সম্ভব। তখনো জানতাম না, ভবিষ্যতে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট আমার পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। জানতাম না, একদিন নিজস্ব প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথে এগোব কিংবা বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সেবা তৈরির সঙ্গে যুক্ত হব।
সেই সময় আমার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল নিজের হাতে কিছু তৈরি করতে পারার অনুভূতি।
শেখার আনন্দ এবং নিজের সীমাবদ্ধতা
প্রযুক্তির সঙ্গে আমার পথচলার শুরুর দিনগুলো খুব সহজ ছিল না। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব, শেখার সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব ছিল। কোনো একটি বিষয় বুঝতে অনেক সময় লাগত। আবার কিছু বিষয় বুঝলেও সেগুলো বাস্তবে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ সব সময় পাওয়া যেত না।
তবে এই সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে নিজের মতো করে শেখার একটি অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। কোনো বিষয় না বুঝলে সেটি নিয়ে আরও পড়ার চেষ্টা করতাম। নতুন কিছু জানতে পারলে তার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য বিষয়গুলোও জানার ইচ্ছা হতো। আর কোনো কিছু নিজে করতে পারলে মনে হতো, এত দিনের চেষ্টা অন্তত কিছুটা হলেও কাজে লেগেছে।
আজকের দিনে ইন্টারনেটে অসংখ্য টিউটোরিয়াল, ভিডিও, অনলাইন কোর্স এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া যায়। কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে কয়েক মুহূর্তেই অনেক তথ্য সামনে চলে আসে। কিন্তু সেই সময় শেখার জন্য এত সহজ সুযোগ ছিল না।
এই পার্থক্যটি এখন আমাকে প্রায়ই ভাবায়। কারণ প্রযুক্তি শেখার সুযোগ যত সহজ হয়েছে, নতুন কিছু শেখার জন্য নিজের ভেতরের আগ্রহ এবং ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা ততটা কমেনি। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় অন্তত এটুকু বুঝেছি, শুধু সুযোগ থাকলেই মানুষ সবকিছু শিখে ফেলে না। শেখার জন্য সেই বিষয়টির প্রতি সত্যিকারের আগ্রহ থাকা প্রয়োজন।
একটি ওয়েবসাইট থেকে আরও বড় স্বপ্নের শুরু
২০০৭ সালে প্রথম ওয়েবসাইট তৈরি করার পর প্রযুক্তিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমার কাছে আগের চেয়ে কিছুটা বদলে যায়।
ইন্টারনেট তখন আর শুধু তথ্য জানার জায়গা ছিল না। এটি এমন একটি মাধ্যম হিসেবে সামনে আসতে শুরু করে, যেখানে নিজের চিন্তা, শেখা এবং সৃজনশীলতাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। একটি ওয়েবসাইট তৈরির অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল, প্রযুক্তি শুধু ব্যবহার করার বিষয় নয়। চাইলে এই প্রযুক্তির সাহায্যে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু তৈরি করাও সম্ভব।
সেই উপলব্ধি থেকেই হয়তো পরবর্তী সময়ে ওয়েবসাইট, সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরির প্রতি আমার আগ্রহ আরও গভীর হতে থাকে। অবশ্য সেই সময়ের স্বপ্ন আর আজকের বাস্তবতার মধ্যে অনেক দীর্ঘ পথ রয়েছে। সেই পথে ছিল নতুন কিছু শেখার অভিজ্ঞতা, ভুল সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা এবং আবার নতুন করে চেষ্টা করার গল্প।
আজ আমি যখন নিজের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান Web Xpress এবং বিভিন্ন সফটওয়্যার পণ্য নিয়ে কাজ করি, তখন মাঝে মাঝে সেই শুরুর দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। এখনকার কাজের পরিধি, দায়িত্ব এবং প্রযুক্তিগত পরিবেশের সঙ্গে সেই সময়ের কোনো তুলনা চলে না। কিন্তু একটি জায়গায় মিল খুঁজে পাই। তখনো নতুন কিছু জানতে ভালো লাগত, এখনো নতুন কিছু তৈরি করতে ভালো লাগে।
সময়ের সঙ্গে কাজের ধরন বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির প্রতি সেই পুরোনো কৌতূহল পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
ফিরে দেখা সেই দিনগুলো
আজ পেছনে তাকালে মনে হয়, জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতার গুরুত্ব আমরা সেই মুহূর্তে বুঝতে পারি না।
এসএসসির পাঠ্যবই বিক্রি করে প্রযুক্তির বই কেনা, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা পূরণ না হওয়া, পার্বতীপুরের কলেজজীবন এবং ২০০৭ সালে নিজের প্রথম ওয়েবসাইট তৈরি করা, সবকিছুই আমার জীবনের আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা।
তখন এগুলোর মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো বড় পরিকল্পনা খুঁজে পাইনি। শুধু নিজের পছন্দের একটি বিষয় নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। জীবনে অনেক কিছুই পরিকল্পনামতো হয় না। কিছু ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যায়, কিছু সুযোগ হাতছাড়া হয়, আবার কখনো অপ্রত্যাশিত কোনো অভিজ্ঞতা নতুন পথের সন্ধান দেয়। আমার প্রযুক্তির সঙ্গে পথচলার শুরুর দিনগুলোতেও এমন অনেক বিষয় ছিল।
কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা পূরণ হয়নি, কিন্তু প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ থেমে যায়নি। নিজের কম্পিউটার না থাকলেও কম্পিউটার সম্পর্কে জানার চেষ্টা বন্ধ করিনি। আর প্রথম ওয়েবসাইট তৈরি করার সময় জানতাম না, এই ছোট্ট অভিজ্ঞতাই একদিন আমার পেশাগত জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যাবে।
এখন বুঝতে পারি, সেই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন শুধু একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের আগ্রহকে বাস্তবে কাজে লাগানোর প্রথম অভিজ্ঞতা অর্জন করা। আমার প্রযুক্তির স্বপ্নের দ্বিতীয় অধ্যায়টি তাই শুধু বই কেনা, কলেজে পড়া কিংবা প্রথম ওয়েবসাইট তৈরির গল্প নয়। এটি এমন একটি সময়ের গল্প, যখন নিজের ভালো লাগার বিষয়টি ধীরে ধীরে আমার ভবিষ্যৎ জীবনের একটি সম্ভাব্য পথ হয়ে উঠছিল।
সামনে যে আরও অনেক কিছু অপেক্ষা করছিল, তা তখনো জানতাম না। শুধু জানতাম, প্রযুক্তির এই পৃথিবী সম্পর্কে আমার আরও অনেক কিছু শেখার আছে।
আর সেই শেখার ইচ্ছাটুকু নিয়েই এগিয়ে চলেছিলাম।

